৩৮ বছরেই জীবনাবসান আফগান পেসার জাদরানের
![]()
বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস; আফগানিস্তানের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক ও দেশটির ক্রিকেটের উত্থানের অন্যতম কারিগরকে হারাল ক্রিকেট বিশ্ব।
আফগানিস্তান ক্রিকেটের উত্থানের অন্যতম কারিগর, সাবেক বাঁহাতি ফাস্ট বোলার শাপুর জাদরান আর নেই। দীর্ঘদিন বিরল ও প্রাণঘাতী রোগে ভোগার পর মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ৩৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে আফগানিস্তানের ক্রিকেটাঙ্গনে।
শাপুর জাদরানের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তার ভাই এবং আফগানিস্তান জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার দৌলত জাদরান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় তিনি লেখেন, “আমার প্রিয় বন্ধু ও ভাই শাপুর জাদরানের মৃত্যুতে আমি ভেঙে পড়েছি। এই ক্ষতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”
জানা গেছে, শাপুর জাদরান ‘হেমোফ্যাগোসাইটিক লিম্ফোহিস্টিওসাইটোসিস’ (এইচএলএইচ) নামে বিরল ও প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত ছিলেন। চিকিৎসার জন্য গত জানুয়ারি থেকে ভারতের নয়াদিল্লির একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও পরে আবার অবনতি হওয়ায় পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেন এই সাবেক পেসার।
আফগানিস্তান জাতীয় দলের শুরুর যুগের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সদস্য ছিলেন শাপুর। ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের মাধ্যমে জাতীয় দলের যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। ২০২০ সালে দেশের হয়ে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে আফগানিস্তানের হয়ে ৮০টি ম্যাচ খেলেছেন শাপুর জাদরান। ওয়ানডেতে ৪৩টি এবং টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৩৭টি উইকেট শিকার করেন তিনি। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার ঝুলিতে রয়েছে ৮০টি উইকেট।

তিনি আফগানিস্তানের হয়ে তিনটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলেছেন। এছাড়া ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া আফগানিস্তান দলেরও সদস্য ছিলেন।
তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত আসে ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে। নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর ম্যাচে এক উইকেটের জয় তুলে নেয় আফগানিস্তান। সেটিই ছিল বিশ্বকাপে দেশটির ইতিহাসের প্রথম জয়। মূলত বোলার হিসেবে পরিচিত হলেও সেই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ক্রিজে থেকে জয়সূচক রানটি করেছিলেন শাপুর জাদরান। আফগান ক্রিকেট ইতিহাসে সেই মুহূর্ত আজও বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে কয়েক বছর দূরে থাকার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দেন শাপুর। বিদায়ী বার্তায় তিনি লিখেছিলেন, “আজ সেই দিন, যেটির মুখোমুখি আমি কখনো হতে চাইনি। কিন্তু প্রতিটি খেলোয়াড়ের জীবনেই একসময় এই দিন আসে।”
তিনি আরও লিখেছিলেন, “২২ বছরের সেবা, ত্যাগ এবং ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসার পর আমি বিদায় নিচ্ছি। ক্রিকেট আমার কাছে শুধু একটি খেলা ছিল না; এটি ছিল আমার আবেগ, পরিচয় এবং জীবনের উদ্দেশ্য।”
নিজের শৈশবের স্বপ্নের কথা স্মরণ করে শাপুর বলেছিলেন, ছোটবেলা থেকেই আফগানিস্তানের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। দেশের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার যাত্রায় অবদান রাখতে পেরে তিনি নিজেকে গর্বিত মনে করতেন।
২০২৫ সালে তার অবসরের সময় আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড এক বিবৃতিতে শাপুর জাদরানকে “আফগানিস্তানে ক্রিকেটের উত্থানের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব” হিসেবে উল্লেখ করে। একই সঙ্গে দেশটির ক্রিকেটের বিকাশে তার অসামান্য অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিল বোর্ড।
আফগানিস্তানকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অপ্রচলিত দল থেকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করার যে প্রজন্মটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, শাপুর জাদরান ছিলেন তাদের অন্যতম। বাঁহাতি পেস, লম্বা গড়ন, আগ্রাসী বোলিং এবং উইকেট উদযাপনের স্বতন্ত্র ভঙ্গির কারণে তিনি দ্রুতই সমর্থকদের প্রিয় হয়ে ওঠেন।
শাপুর জাদরানের মৃত্যুতে আফগানিস্তান হারাল তাদের ক্রিকেট ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে। তবে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় এবং দেশের ক্রিকেটের উত্থানে তার অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সংবাদ-সংগৃহিত
Leave a Reply